লোডশেডিং ও গ্যাস সংকট: জনগণের দুর্ভোগের দায় কে নেবে?
বাংলাদেশ উন্নয়নের নানা সূচকে এগিয়ে যাওয়ার দাবি করলেও বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট যেন সেই উন্নয়নের বাস্তব চিত্রকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। ২০২৬ সালের আগস্টে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক লোডশেডিং, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ queues—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে কোথাও কোথাও দিনে ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার কথাও উঠে এসেছে।
প্রশ্ন হলো—এই পরিস্থিতির দায় কি শুধু একটি এলএনজি টার্মিনালের দুর্ঘটনা, খারাপ আবহাওয়া কিংবা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায়?
নিশ্চয়ই আন্তর্জাতিক বাজার, এলএনজি সরবরাহ এবং প্রযুক্তিগত দুর্ঘটনার প্রভাব রয়েছে। সরকারও বলেছে, একটি এলএনজি টার্মিনালের সমস্যার কারণে গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা যদি একটি বা দুটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেটিও তো দীর্ঘমেয়াদি নীতির ব্যর্থতার প্রশ্ন তোলে।
বিদ্যুৎ আছে, কিন্তু মানুষ বিদ্যুৎ পায় না!
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বড় বড় সাফল্যের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে যখন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে, তখন দেখা যায় জ্বালানির অভাবে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। আগস্টের শুরুতে জাতীয় পর্যায়ে লোডশেডিং ৩,০০০ মেগাওয়াটের বেশি পর্যন্ত উঠেছিল।
এখানেই সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলেই কি বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়? বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস, কয়লা, তেল এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কি সরকারের দায়িত্ব নয়?
বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও যদি জ্বালানি না থাকে, তাহলে সেই সক্ষমতা জনগণের কোনো কাজে আসে না। বরং এটি হয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের একটি বড় অপচয়ের উদাহরণ।
গ্যাস সংকট শুধু চুলার সমস্যা নয়
গ্যাস সংকটকে অনেক সময় শুধু বাসাবাড়ির রান্নার সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে এর প্রভাব অনেক গভীর। গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে যায়, কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়, সিএনজি পরিবহন সংকটে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়া এবং অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
অর্থাৎ গ্যাসের সংকট মানে শুধু একটি চুলায় আগুন না জ্বলা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন, দ্রব্যমূল্য, পরিবহন এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি।
সরকারের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সংকট মোকাবিলায় ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু জনগণের প্রশ্ন আরও মৌলিক—সংকট মোকাবিলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি কোথায়?
একটি টার্মিনাল বন্ধ হলে কেন পুরো জ্বালানি ব্যবস্থায় এত বড় ধাক্কা লাগবে? বিকল্প উৎস কতটা প্রস্তুত? দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কোথায়?
সরকারের উচিত শুধু সংকটের সময় জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া নয়; সংকট যাতে বারবার তৈরি না হয়, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
জনগণকে শুধু ধৈর্য ধরতে বলা যথেষ্ট নয়
লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। প্রচণ্ড গরমে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ কষ্ট পাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জেনারেটর বা অতিরিক্ত জ্বালানির খরচ বহন করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতেও এর প্রভাব পড়ছে।
আর যখন বিদ্যুৎ থাকে না, তখন মানুষের মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে পানির পাম্প, দোকানের ফ্রিজ, ছোট কারখানার মেশিন—সবকিছুই অচল হয়ে পড়ে।
রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়—নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, পর্যাপ্ত গ্যাস এবং জ্বালানি নিরাপত্তা।
এখনই প্রয়োজন জবাবদিহি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
সরকারকে কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত এবং স্বচ্ছ পদক্ষেপ নিতে হবে—
প্রথমত, বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রকৃত কারণ জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কোন কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানির অভাবে উৎপাদন করতে পারছে না, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করতে হবে।
তৃতীয়ত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
চতুর্থত, এলএনজি আমদানির পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি উৎস ও সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
পঞ্চমত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অদক্ষতা, অপচয়, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
ষষ্ঠত, সাধারণ মানুষের জন্য বাস্তবসম্মত ও পূর্বঘোষিত লোডশেডিং সূচি দিতে হবে, যাতে মানুষ অন্তত নিজেদের দৈনন্দিন জীবন কিছুটা পরিকল্পনা করতে পারেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিষয় না বানিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে দেখতে হবে।
শেষ কথা
বাংলাদেশের মানুষ বারবার সংকট মোকাবিলা করেছে। কিন্তু প্রতিবার সংকটের সময় জনগণকে শুধু বলা হবে—“পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে”—এটি আর যথেষ্ট নয়।
আজ জনগণ জানতে চায়, কেন বারবার বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট তৈরি হচ্ছে? কেন আগে থেকে প্রস্তুতি থাকে না? কেন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় এমন দুর্বলতা তৈরি হয় যে একটি উৎসের সমস্যা পুরো দেশের ওপর প্রভাব ফেলে?
সরকারের সমালোচনা মানেই সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। বরং জনগণের কষ্টের কথা বলা এবং সরকারের কাছে জবাবদিহি দাবি করাই একটি গণতান্ত্রিক সমাজে নাগরিক দায়িত্ব।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস কোনো বিলাসিতা নয়—এগুলো মানুষের জীবন, শিল্প, কৃষি, শিক্ষা ও অর্থনীতির মৌলিক চালিকাশক্তি। তাই লোডশেডিং ও গ্যাস সংকটকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে পাশ কাটিয়ে না গিয়ে সরকারকে এখনই দীর্ঘমেয়াদি, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক জ্বালানি নীতি গ্রহণ করতে হবে।
জনগণ প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব সমাধান চায়। আর সেই সমাধানের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সরকারেরই।

