হামের কারনে শিশু মৃত্যু, সরকারের উদাসীনতাই দায়ী।

বাংলাদেশে আবারও বাড়ছে হাম রোগের সংক্রমণ। একসময় টিকাদানের সাফল্যে নিয়ন্ত্রণে চলে আসা এই রোগ এখন আবার শিশুদের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই মৃত্যুগুলোর বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য ছিল। একটি টিকা, কিছু সচেতনতা এবং কার্যকর সরকারি উদ্যোগ হয়তো বাঁচিয়ে দিতে পারত অসংখ্য শিশুর জীবন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা এখনও উদাসীন।
হাম শুধু একটি সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগ নয়। এটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং অপুষ্ট শিশুদের জন্য মারাত্মক হতে পারে। জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া কিংবা শরীরে ফুসকুড়ি—প্রথমে সাধারণ উপসর্গ মনে হলেও দ্রুত নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে। গ্রামাঞ্চল ও শহরের বস্তিগুলোতে এই ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ সেখানে স্বাস্থ্যসেবা দুর্বল এবং টিকাদানের কভারেজ অসম্পূর্ণ।
সরকার প্রায়ই দাবি করে, দেশে টিকাদান কর্মসূচি সফল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—যদি সত্যিই সফল হয়, তাহলে কেন এখনও হাম রোগে শিশুর মৃত্যু ঘটছে? কেন অনেক এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম পৌঁছায় না? কেন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জাম নেই? এসব প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়া মানে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বহুবার বলা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব কম। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা আজও স্পষ্ট। অনেক অভিভাবক টিকা সম্পর্কে সঠিক তথ্য পান না। কোথাও কোথাও গুজব ও ভুল তথ্যের কারণে মানুষ টিকা নিতে ভয় পায়। অথচ সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব ছিল নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচার চালানো এবং মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা।
সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, শিশু মৃত্যুর খবর কয়েকদিন আলোচনায় থাকলেও পরে তা হারিয়ে যায় রাজনৈতিক বিতর্ক কিংবা অন্য সংবাদে। কিন্তু যে পরিবার একটি শিশুকে হারায়, তাদের জন্য এই ক্ষতি আজীবনের। একটি রাষ্ট্র তখনই মানবিক হয়, যখন সে সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। শিশুদের বাঁচাতে ব্যর্থতা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি নৈতিক ব্যর্থতাও।
বাংলাদেশ অতীতে টিকাদানে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। সেই অর্জন ধরে রাখতে হলে শুধু কাগুজে সাফল্য দেখালেই চলবে না। প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ—প্রতিটি শিশুর কাছে টিকা পৌঁছে দেওয়া, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ বাড়ানো, স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা এবং জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি করা।
হাম রোগে একটি শিশুর মৃত্যুও মেনে নেওয়া যায় না, কারণ এই মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই এখনই সময় উদাসীনতা ভেঙে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার। নয়তো আগামী দিনে আরও অনেক শিশুর জীবন হারানোর দায় এড়াতে পারবে না কেউই।

Maniruzzaman

I am Maniruzzaman, a free thinker and political commentator, dedicated to unraveling the complexities of Bangladesh’s political landscape.

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button